নেপালের বিপর্যয়ের পর উত্তরবঙ্গের পাহাড়ে নজর, হবে বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা
নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা: নেপালের ভয়াবহ বিপর্যয়ের অভিঘাত এবার উত্তরবঙ্গের পাহাড় নিয়েও নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে রাজ্য সরকারকে। দার্জিলিং ও কালিম্পং-সহ পশ্চিমবঙ্গের হিমালয় সংলগ্ন অঞ্চলের ভূতাত্ত্বিক ও পরিবেশগত ঝুঁকি খতিয়ে দেখতে দ্রুত একটি বৈজ্ঞানিক সমীক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পাহাড়ের স্থিতিশীলতা থেকে শুরু করে ভূমিধস, মেঘভাঙা বৃষ্টি, হিমবাহ-উৎপন্ন হ্রদ এবং নদীর গতিপথে পরিবর্তনের মতো সম্ভাব্য বিপদের দিকগুলি এই সমীক্ষার আওতায় আসতে পারে।
মঙ্গলবার নবান্নে ‘অর্জুন বাহিনী’ উদ্বোধনের অনুষ্ঠানে এই উদ্যোগের কথা জানান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। দার্জিলিংয়ের বিজেপি সাংসদ রাজু বিস্তার প্রস্তাবের ভিত্তিতেই হিমালয় অঞ্চলের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে এই সমীক্ষার উদ্যোগ বলে জানা গিয়েছে। রাজু বিস্তা পশ্চিমবঙ্গের হিমালয় অঞ্চলের ঝুঁকি নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ ও বৈজ্ঞানিক মূল্যায়নের আবেদন জানিয়েছিলেন। মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, সেই প্রস্তাব মুখ্যসচিবের কাছে পাঠানো হয়েছে। কেন্দ্র ও রাজ্য যৌথভাবে পাহাড়ের ভৌগোলিক ও ভূতাত্ত্বিক পরিস্থিতি খতিয়ে দেখবে বলেও জানান তিনি।
নেপালে সাম্প্রতিক ভয়াবহ বিপর্যয়ের পর গোটা হিমালয় অঞ্চলেই প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। হিমবাহের পরিবর্তন, আকস্মিক বন্যা এবং পাহাড়ি ঢালের স্থিতিশীলতা নিয়ে আন্তর্জাতিক স্তরেও সতর্কবার্তা এসেছে। সেই প্রেক্ষাপটে দার্জিলিং-কালিম্পংয়ের মতো ভূতাত্ত্বিকভাবে সংবেদনশীল এলাকায় আগাম ঝুঁকি চিহ্নিত করার প্রয়োজনীয়তা আরও বেড়েছে।
প্রস্তাবিত সমীক্ষায় শুধু পাহাড়ের বর্তমান পরিস্থিতিই নয়, ভবিষ্যতে কোন কোন এলাকায় বড় ধরনের বিপর্যয়ের আশঙ্কা বেশি, তা চিহ্নিত করার উপরও জোর দেওয়া হতে পারে। দার্জিলিং পাহাড়ের পাশাপাশি তেরাই ও ডুয়ার্স অঞ্চলের কথাও বিশেষভাবে সামনে এসেছে। পাহাড়ে অতিবৃষ্টি বা ভূমিধসের মতো ঘটনা ঘটলে তার প্রভাব অনেক সময় নেমে আসে নিচের সমতল এলাকাতেও। ফলে পাহাড় ও সমতলকে আলাদা করে না দেখে বৃহত্তর ভৌগোলিক অঞ্চলের ঝুঁকি মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তার কথাই বলছেন প্রশাসনের কর্তারা।
এর পাশাপাশি দুর্যোগ মোকাবিলায় উত্তরবঙ্গে রাজ্যের প্রস্তুতিও জোরদার করা হচ্ছে। মঙ্গলবারই ২০০ সদস্যের ‘অর্জুন বাহিনী’ আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে এই বাহিনীর ১০০ জন কলকাতায়, ৫০ জন দার্জিলিং ও কালিম্পং পাহাড়ে এবং বাকি ৫০ জন সুন্দরবন এলাকায় মোতায়েন থাকবেন। প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা পরিকাঠামোগত বিপর্যয়ের ক্ষেত্রে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধারকাজে সহায়তা করাই হবে এই বাহিনীর মূল দায়িত্ব।
তবে ৫০ জনের এই সংখ্যা কোনও বিশেষজ্ঞ সমীক্ষা কমিটির সদস্যসংখ্যা নয়। এটি ‘অর্জুন বাহিনী’র প্রাথমিক মোতায়েনের হিসাব। প্রস্তাবিত হিমালয় সমীক্ষার ক্ষেত্রে কেন্দ্র ও রাজ্যের যৌথভাবে কী কাঠামোয় কাজ হবে, কোন কোন সংস্থা বা বিশেষজ্ঞকে যুক্ত করা হবে এবং সমীক্ষার সময়সীমা কী হবে, সে বিষয়ে আরও বিস্তারিত সিদ্ধান্ত সামনে আসার অপেক্ষা রয়েছে।
পাহাড়ে বারবার ভূমিধস, রাস্তা বিপর্যয় এবং অতিবৃষ্টির মতো ঘটনা সামনে আসার পর উত্তরবঙ্গের পরিবেশ ও ভূতাত্ত্বিক নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার দাবি নতুন নয়। নেপালের সাম্প্রতিক বিপর্যয় সেই আলোচনাকেই আরও তীব্র করেছে। এবার প্রস্তাবিত বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা কতটা দ্রুত শুরু হয় এবং তার সুপারিশের ভিত্তিতে পাহাড়ে নির্মাণ ও উন্নয়ন প্রকল্পের ক্ষেত্রে নতুন কোনও নিরাপত্তা নীতি নেওয়া হয় কি না, সেদিকেই নজর থাকবে।
