টাকার বিনিময়ে ডিগ্রির অভিযোগ, রাজ্যের ৪৫০-র বেশি B.Ed কলেজকে শোকজ! পরিদর্শনে চাঞ্চল্যকর তথ্য
কলকাতা: পশ্চিমবঙ্গের B.Ed কলেজগুলিতে একের পর এক অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসতেই বড়সড় পদক্ষেপ করল রাজ্যের উচ্চশিক্ষা দফতর। রাজ্যের ৪৫০টিরও বেশি B.Ed কলেজকে কারণ দর্শানোর নোটিস বা শোকজ করা হয়েছে। অভিযোগের মধ্যে রয়েছে পরিকাঠামোগত ঘাটতি, শিক্ষাদানের মান নিয়ে প্রশ্ন, নিয়ম না মেনে কলেজ পরিচালনা এবং টাকার বিনিময়ে ডিগ্রি দেওয়ার অভিযোগ।
তবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, ৪৫০টি কলেজই যে টাকা নিয়ে ডিগ্রি বিক্রি করেছে, এমন কোনও প্রমাণ এখনও প্রকাশ্যে আসেনি। ‘ক্যাশ ফর ডিগ্রি’ বা টাকার বিনিময়ে ডিগ্রি দেওয়ার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতেই রাজ্যজুড়ে পরিদর্শন চালানো হয় এবং সেই পরিদর্শনে বিভিন্ন অনিয়ম সামনে আসে।
৬০২টি B.Ed কলেজে পরিদর্শন
উচ্চশিক্ষামন্ত্রী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায় জানিয়েছেন, জুলাই ও আগস্ট মাসজুড়ে রাজ্যের সমস্ত ৬০২টি B.Ed কলেজে পরিদর্শন চালানো হয়। পরিকাঠামো, শিক্ষক-শিক্ষিকার উপস্থিতি, পঠনপাঠনের মান এবং অন্যান্য বিষয় বিবেচনা করে ১০০ নম্বরের একটি মাপকাঠিতে কলেজগুলির মূল্যায়ন করা হয়।
সেই মূল্যায়নে রাজ্যের B.Ed কলেজগুলির গড় স্কোর দাঁড়িয়েছে মাত্র ৫১.৫। পরিদর্শনের ফল সামনে আসার পরই বড় সংখ্যক কলেজকে শোকজ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
৫৩টি কলেজের অস্তিত্বই মিলল না!
পরিদর্শনে সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্যগুলির একটি হল—৬০২টি কলেজের মধ্যে ৫৩টি কলেজ তাদের নথিভুক্ত ঠিকানায় বাস্তবে পাওয়া যায়নি। কোনও কোনও জায়গায় কলেজের দরজা তালাবন্ধ ছিল, আবার কোথাও নথিতে দেখানো ঠিকানায় অন্য ধরনের কাজ চলছিল বলে পরিদর্শনে উঠে এসেছে।
এছাড়াও ১৭টি ক্ষেত্রে B.Ed কলেজের NOC বা অনুমোদনের ঠিকানা হিসেবে ফ্ল্যাট কিংবা ড্রয়িংরুমের মতো আবাসিক ঠিকানা ব্যবহারের অভিযোগ সামনে এসেছে।
একই জায়গায় একাধিক প্রতিষ্ঠান?
পরিদর্শনের সময় কিছু ক্ষেত্রে একই জায়গায় একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হওয়ার অভিযোগও সামনে এসেছে। অভিযোগ, B.Ed, পলিটেকনিক ও ফার্মেসির মতো আলাদা প্রতিষ্ঠান একই পরিকাঠামো ব্যবহার করছে এবং শুধুমাত্র সাইনবোর্ড পরিবর্তন করে পৃথক প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখানো হচ্ছে।
এছাড়াও ২৬৫টি প্রতিষ্ঠানকে কার্যত অকার্যকর বা শিক্ষক-প্রশিক্ষণের জন্য অনুপযুক্ত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আরও ১২১টি কলেজের পরিকাঠামো গুরুতরভাবে দুর্বল বলে রিপোর্টে উঠে এসেছে।
১০০-তে ৩০-এর নিচে নম্বর ১১৪ কলেজের
পরিদর্শনের মূল্যায়নে ১১৪টি কলেজ ১০০ নম্বরের মধ্যে ৩০-এরও কম নম্বর পেয়েছে। অন্যদিকে তুলনামূলকভাবে সন্তোষজনক অবস্থায় থাকা ১৫১টি কলেজ ৬৫ থেকে ৮৫-এর মধ্যে স্কোর করেছে বলে উচ্চশিক্ষা দফতরের তথ্য উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনগুলিতে জানানো হয়েছে।
ফলে শুধু অনুমোদন বা কাগজপত্র থাকলেই কোনও প্রতিষ্ঠানকে কার্যকর B.Ed কলেজ হিসেবে চালানোর সুযোগ দেওয়া হবে না—এমনই বার্তা দিয়েছে রাজ্য সরকার।
‘টাকার বিনিময়ে ডিগ্রি’ অভিযোগ কী?
উচ্চশিক্ষা দফতরের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রতিবেশী একটি রাজ্যের মুখ্যসচিব পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যসচিবকে চিঠি দিয়ে অভিযোগ জানান যে, অন্য রাজ্যের কিছু পড়ুয়া পশ্চিমবঙ্গের B.Ed-সহ বিভিন্ন পেশাগত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত ক্লাস না করেও টাকা দিয়ে ডিগ্রি নিচ্ছেন।
এই অভিযোগের পরেই রাজ্যের B.Ed কলেজগুলির পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে বিশেষ পরিদর্শন শুরু করা হয়।
উচ্চশিক্ষামন্ত্রী দাবি করেছেন, B.Ed-এর পাশাপাশি কিছু পলিটেকনিক, ITI এবং ফার্মেসি প্রতিষ্ঠানেও নিয়মবহির্ভূতভাবে ডিগ্রি বা সার্টিফিকেট দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। তবে এগুলি বর্তমানে অভিযোগের পর্যায়ে রয়েছে; তদন্তের ফল না আসা পর্যন্ত এগুলিকে প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে দেখানো হচ্ছে না।
বছরে ৬২ হাজারের বেশি B.Ed ডিগ্রি
মন্ত্রী জানিয়েছেন, পশ্চিমবঙ্গে বছরে ৬২ হাজারেরও বেশি B.Ed ডিগ্রি দেওয়া হয়। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, গোয়া, উত্তর-পূর্ব ভারত এবং পার্শ্ববর্তী রাজ্য থেকেও বহু পড়ুয়া পশ্চিমবঙ্গের B.Ed কলেজে ভর্তি হন।
নিয়মিত ক্লাস না করেও কীভাবে পড়ুয়ারা পরীক্ষায় বসে ডিগ্রি পাচ্ছেন, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন মন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, শিক্ষক তৈরির মতো গুরুত্বপূর্ণ পেশাগত শিক্ষাকে কোনওভাবেই বাণিজ্যে পরিণত হতে দেওয়া যাবে না।
২১ দিনের মধ্যে জবাব
শোকজ করা কলেজগুলিকে ২১ দিনের মধ্যে নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে হবে। পাশাপাশি পরিদর্শনে চিহ্নিত ঘাটতি কীভাবে পূরণ করা হবে, সে সম্পর্কেও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে জানাতে হবে।
কলেজগুলির জবাব সন্তোষজনক না হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে সরকার। প্রয়োজনে ভর্তি বন্ধ করা এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের affiliation বা অনুমোদন বাতিলের মতো পদক্ষেপও নেওয়া হতে পারে।
১৫ বছরের অনিয়ম নিয়ে শ্বেতপত্রের ইঙ্গিত
উচ্চশিক্ষামন্ত্রী আরও জানিয়েছেন, গত ১৫ বছরে রাজ্যের শিক্ষাক্ষেত্রে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয় নিয়ে একটি শ্বেতপত্র প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
B.Ed কলেজ সংক্রান্ত তদন্তের ফলাফল বিচারপতি বিশ্বজিৎ বসুর নেতৃত্বাধীন কমিশনের কাছেও পাঠানো হবে বলে জানানো হয়েছে।
সব মিলিয়ে, রাজ্যের B.Ed শিক্ষা ব্যবস্থায় পরিকাঠামো, নিয়ম মেনে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা এবং শিক্ষার মান নিয়ে যে প্রশ্নগুলি উঠেছে, তা এখন বড়সড় প্রশাসনিক পদক্ষেপের দিকে গড়াচ্ছে। ৪৫০টিরও বেশি কলেজের শোকজের জবাবের পরই পরবর্তী পদক্ষেপ কতটা কঠোর হবে, এখন সেদিকেই নজর।
