দক্ষিণবঙ্গে বন্যার আশঙ্কা এখনও কাটেনি, DVC-র জলছাড়া কমলেও বাড়ছে নদীর জলস্তর
নিজস্ব প্রতিবেদন : নাগাড়ে বৃষ্টি এবং ডিভিসির জলছাড়াকে ঘিরে দক্ষিণবঙ্গে বন্যা পরিস্থিতির উদ্বেগ এখনও কাটেনি। মাইথন ও পাঞ্চেত জলাধার থেকে জলছাড়ার পরিমাণ কিছুটা কমানো হলেও একাধিক জেলায় নদীর জলস্তর বাড়ছে। নিচু এলাকা ও নদী তীরবর্তী অঞ্চলে পরিস্থিতির দিকে কড়া নজর রাখছে প্রশাসন।
ডিভিসির সরকারি বন্যা সতর্কবার্তা অনুযায়ী, ৪ সেপ্টেম্বর ভোর ২টায় মাইথন ও পাঞ্চেত জলাধার থেকে জলছাড়ার পরিমাণ ৯৮,০০০ কিউসেক ছিল। এর আগে বুধবার সন্ধ্যায় দুই জলাধার মিলিয়ে প্রায় ১.২ লক্ষ কিউসেক জল ছাড়া হয়েছিল।
পাঁচ জেলায় বিশেষ সতর্কতা
ডিভিসির জলছাড়ার প্রভাবে পূর্ব বর্ধমান, পশ্চিম বর্ধমান, বাঁকুড়া, হুগলি ও হাওড়া জেলার নিচু এলাকা এবং নদী তীরবর্তী অঞ্চলে সতর্কতা জারি করা হয়েছে। প্রশাসনকে নদীর পরিস্থিতি নজরে রাখা এবং সম্ভাব্য প্লাবনের জন্য প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে।
ডিভিসি জানিয়েছে, জলাধারগুলির ক্যাচমেন্ট এলাকায় প্রবল বৃষ্টি এবং ঝাড়খণ্ডের টেনুঘাট থেকে অতিরিক্ত জল আসার ফলে মাইথন ও পাঞ্চেত জলাধারে চাপ বেড়েছিল। সেই পরিস্থিতি সামাল দিতে ড্যামোদর ভ্যালি রিজার্ভয়ার রেগুলেশন কমিটির সিদ্ধান্তে জল ছাড়া হয়। বৃষ্টিপাত ও জলপ্রবাহের পরিস্থিতি অনুযায়ী জলছাড়ার পরিমাণ ফের পর্যালোচনা করা হতে পারে।
জলছাড়া কমেছে, কিন্তু বিপদ পুরো কাটেনি
বৃহস্পতিবার বিকেলের দিকে মাইথন ও পাঞ্চেত থেকে জলছাড়ার পরিমাণ ১.২ লক্ষ কিউসেক থেকে কমে প্রায় ৯৮ হাজার কিউসেক হয়। ফলে বন্যার ঝুঁকির মাত্রা কিছুটা কমেছে বলে ডিভিসি সূত্রে জানানো হয়েছিল। তবে নিচু দামোদর অববাহিকায় ইতিমধ্যেই জলস্তর বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি।
ডিভিসির বক্তব্য, অতিরিক্ত জলাধার-চাপ সামলানো এবং বাঁধের নিরাপত্তা বজায় রাখার জন্য নিয়ন্ত্রিত জলছাড়া প্রয়োজনীয়। একই সঙ্গে জলছাড়ার ফলে নিচের দিকে থাকা এলাকাগুলিতে যাতে আগাম প্রস্তুতি নেওয়া যায়, সে জন্য রাজ্য সরকার ও সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসনকে সতর্ক করা হয়েছে।
বৃষ্টির পূর্বাভাসও চিন্তা বাড়াচ্ছে
ডিভিসির জলছাড়ার পাশাপাশি দক্ষিণবঙ্গের আবহাওয়াও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে। ভারতীয় আবহাওয়া দফতরের ৪ সেপ্টেম্বরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গে ৪ ও ৫ সেপ্টেম্বর ভারী বৃষ্টির পাশাপাশি বজ্রবিদ্যুৎ ও ঝোড়ো হাওয়ার সতর্কতা রয়েছে। ৮ সেপ্টেম্বর থেকে ফের ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনার কথাও জানিয়েছে হাওয়া অফিস।
কলকাতা-হাওড়া অঞ্চলের জন্যও ৪ সেপ্টেম্বর সাধারণত মেঘলা আকাশের সঙ্গে এক-দু’দফা বৃষ্টি বা বজ্রবিদ্যুৎ-সহ বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে। সঙ্গে ঘণ্টায় ৩০–৪০ কিলোমিটার বেগে ঝোড়ো হাওয়ার সতর্কতাও রয়েছে।
কেন দক্ষিণবঙ্গে দ্রুত বাড়ে বন্যার আশঙ্কা?
দক্ষিণবঙ্গের বন্যা পরিস্থিতি শুধু স্থানীয় বৃষ্টির উপর নির্ভর করে না। ঝাড়খণ্ডের উঁচু পার্বত্য ও মালভূমি অঞ্চল থেকে দ্রুত নেমে আসা জল, বিভিন্ন নদীর অতিরিক্ত প্রবাহ এবং নিচু সমতলে নদীগুলির জল বহনের সীমাবদ্ধতা—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি দ্রুত জটিল হয়ে উঠতে পারে।
পশ্চিমবঙ্গের সেচ ও জলপথ দফতরের তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণবঙ্গের ভূপ্রকৃতি এবং নদী ব্যবস্থার বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কারণে বর্ষাকালে একই সময়ে অতিরিক্ত জল নামলে বন্যার পরিমাণ দ্রুত বেড়ে যেতে পারে। বিশেষ করে দামোদর, অজয়, ময়ূরাক্ষী-সহ একাধিক নদী অববাহিকার জল শেষ পর্যন্ত ভাগীরথী-হুগলি নদী ব্যবস্থার দিকে নামে।
প্রশাসনের নজর নদী তীরবর্তী এলাকায়
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে নদীর জলস্তর, বাঁধ ও নদী তীরবর্তী নিচু এলাকার দিকে। ডিভিসির সতর্কবার্তার পর সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসনগুলিকে প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে। সম্ভাব্য প্লাবনের ক্ষেত্রে দ্রুত মানুষকে নিরাপদ জায়গায় সরানো, যোগাযোগ ব্যবস্থা সচল রাখা এবং ত্রাণ প্রস্তুত রাখার বিষয়েও নজর রয়েছে।
আকাশে মেঘ এবং ফের বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকায় আগামী কয়েক ঘণ্টা গুরুত্বপূর্ণ। ডিভিসির জলছাড়ার পরিমাণ আরও কমে কি না, নাকি ক্যাচমেন্ট এলাকায় নতুন করে বৃষ্টি হলে তা আবার বাড়াতে হয়—তার উপরই দক্ষিণবঙ্গের বন্যা পরিস্থিতির পরবর্তী গতিপথ অনেকটাই নির্ভর করবে।
এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় বার্তা—জলছাড়ার পরিমাণ কমেছে ঠিকই, কিন্তু বন্যার আশঙ্কা এখনও পুরোপুরি কেটে যায়নি। নদী তীরবর্তী ও নিচু এলাকার বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
