ক্যামাক স্ট্রিটে তৃণমূলের অফিসে ভাঙচুর, গ্রেফতার ৬! CCTV ঘিরে রাজনৈতিক চাপানউতোর
কলকাতা : কলকাতার ক্যামাক স্ট্রিটে তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দফতরে ভাঙচুরের ঘটনায় ছয় জনকে গ্রেফতার করেছে কলকাতা পুলিশ। বৃহস্পতিবার ভোরে ৯ নম্বর ক্যামাক স্ট্রিটের বহুতলের সপ্তম তলায় থাকা তৃণমূলের অফিসে একদল মুখোশধারী ঢুকে ভাঙচুর চালায় বলে অভিযোগ। ঘটনার পর থেকেই তৃণমূল ও বিজেপির মধ্যে শুরু হয়েছে তীব্র রাজনৈতিক চাপানউতোর।
পুলিশ জানিয়েছে, ধৃত ছয় জনই হাওড়ার বাসিন্দা। তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ করে হামলার উদ্দেশ্য এবং ঘটনার সঙ্গে আরও কেউ যুক্ত কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এখনও পর্যন্ত ধৃতদের কোনও রাজনৈতিক যোগের কথা পুলিশ নিশ্চিত করেনি।
ভোর সাড়ে ৪টায় অফিসে ঢোকে হামলাকারীরা
পুলিশ ও প্রকাশিত CCTV-র তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার ভোরে প্রায় সাড়ে ৪টে নাগাদ ১৪ জন মুখোশধারী ক্যামাক স্ট্রিটের ওই অফিসে ঢোকে বলে অভিযোগ। তাঁদের মধ্যে সাত জন সিঁড়ি দিয়ে এবং আরও সাত জন লিফট ব্যবহার করে সপ্তম তলায় পৌঁছয় বলে পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে।
অভিযোগ, অফিসে ঢুকে তাঁরা কম্পিউটার, CCTV মনিটর এবং কাচের অংশে ভাঙচুর চালায়। কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথি ও ফাইলও নিয়ে যাওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। পরে CCTV ফুটেজ সামনে আসার পর ঘটনাটি নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক আরও তীব্র হয়।
অফিসের কর্মীদের মারধরের অভিযোগ
তৃণমূলের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, হামলাকারীরা অফিসের কয়েকজন কর্মীকেও মারধর করে এবং তাঁদের মোবাইল ফোন কেড়ে নেয়, যাতে তাঁরা সাহায্যের জন্য যোগাযোগ করতে না পারেন। দলের পক্ষ থেকে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, ঘটনার সময় পুলিশকে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
তবে কলকাতা পুলিশের বক্তব্য, থানায় খবর পাওয়ার পর পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছয়। পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম) কুণাল আগরওয়াল জানিয়েছেন, সকাল ৬টার কিছু আগে শেক্সপিয়র সরণি থানায় খবর আসে, এরপর পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে ছয় জনকে গ্রেফতার করে। ঘটনাস্থল এবং ধৃতদের কাছ থেকে বিভিন্ন সামগ্রীও উদ্ধার করা হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
ধৃত ৬ জন কারা?
পুলিশের হাতে গ্রেফতার হওয়া ছয় জনের নাম প্রকাশিত হয়েছে—
- শঙ্কর রাও
- অবিনাশ শা
- সুখদেব গুপ্ত
- সুরজ শা
- ভোম্বল মণ্ডল
- রোহিত পোরেল
তাঁদের অধিকাংশের বাড়ি হাওড়া এলাকায় বলে পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে। ধৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ করে বাকি অভিযুক্তদের শনাক্ত ও গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।
BJP-র বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ অভিষেকের
ঘটনার পর তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় CCTV ফুটেজ প্রকাশ করে অভিযোগ করেন, হামলার পিছনে BJP-র লোকজন রয়েছে। তাঁর দাবি, হামলাকারীরা অস্ত্র নিয়ে অফিসে ঢুকে কর্মীদের উপর হামলা চালায় এবং নথিপত্র ও বৈদ্যুতিন সরঞ্জাম নষ্ট করে। তিনি পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।
মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও ঘটনাটির তীব্র নিন্দা করেছেন। তৃণমূলের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু এবং রাজ্যপাল আর এন রবির সঙ্গে দেখা করার জন্য সময় চাওয়া হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
BJP-র পাল্টা দাবি
তৃণমূলের অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছে BJP। দলের রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য দাবি করেছেন, এই ঘটনার সঙ্গে BJP-র যোগ নেই। BJP-র কয়েকজন নেতা বরং তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের দিকে ইঙ্গিত করেছেন এবং ঘটনাটিকে সাজানো হতে পারে বলেও দাবি করেছেন।
অর্থাৎ, রাজনৈতিক অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ থাকলেও তদন্তের এই পর্যায়ে হামলার সঙ্গে কোনও রাজনৈতিক দলের প্রত্যক্ষ যোগ পুলিশ নিশ্চিত করেনি।
আগের ঘটনাও রয়েছে একই অফিস ঘিরে
ক্যামাক স্ট্রিটের ওই তৃণমূল অফিসকে ঘিরে এর আগেও বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। কয়েক দিন আগে অনুমোদনহীন বিলবোর্ড সরানোকে কেন্দ্র করে কলকাতা পুরসভা ও তৃণমূলের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল। সেই ঘটনায় একাধিক FIR এবং গ্রেফতারির ঘটনাও ঘটে। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ও তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদ ডেরেক ও’ব্রায়েনকেও পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করেছে।
এরপর ওই ভবনের অগ্নিনিরাপত্তা নিয়েও দমকল বিভাগের নোটিসের খবর প্রকাশ্যে আসে। ফলে একই দফতরকে ঘিরে পরপর একাধিক ঘটনায় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
এখন পুলিশের নজরে হামলার আসল উদ্দেশ্য
ছয় জনকে গ্রেফতারের পর এখন তদন্তের মূল লক্ষ্য—হামলার পরিকল্পনা কে করেছিল, ধৃতদের সঙ্গে আরও কারা যুক্ত এবং নথি বা অন্যান্য সামগ্রী নিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্য কী ছিল।
পুলিশ জানিয়েছে, ধৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে এবং CCTV ফুটেজ খতিয়ে দেখে বাকি অভিযুক্তদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে তাঁদের কোনও রাজনৈতিক যোগ রয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের অংশ।
ফলে ক্যামাক স্ট্রিটের এই ঘটনা আপাতত শুধু একটি রাজনৈতিক দলের অফিসে ভাঙচুরের ঘটনায় সীমাবদ্ধ নেই। গ্রেফতার ছয় জনের পরিচয়, হামলার উদ্দেশ্য এবং রাজনৈতিক যোগের প্রমাণ তদন্তে কী উঠে আসে—এখন সেদিকেই নজর।
