উত্তরবঙ্গের নদী নিয়ে বড় নির্দেশ, তিস্তা-সহ একাধিক নদীতে খননের প্রস্তুতি
শিলিগুড়ি: বর্ষার মরসুমে উত্তরবঙ্গের নদীগুলির পরিস্থিতি নিয়ে আগাম সতর্ক রাজ্য সরকার। পাহাড়ে ধস, নদীতে পলি জমা এবং অতীতের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের অভিজ্ঞতা মাথায় রেখে উত্তরবঙ্গের নদীগুলির বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত রিপোর্ট চেয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। কোন নদীর কোথায় কী পরিস্থিতি, কোথায় দ্রুত খননের প্রয়োজন—সেই তথ্যও প্রশাসনের কাছে চাওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার শিলিগুড়ির উত্তরকন্যায় অনুষ্ঠিত প্রশাসনিক পর্যালোচনা বৈঠকে উত্তরবঙ্গের নদী ও দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলা প্রশাসনের আধিকারিক এবং সংশ্লিষ্ট দফতরের আধিকারিকেরা ভার্চুয়ালি যোগ দেন। রেল, বিমানবন্দর এবং সীমান্তরক্ষী বাহিনীর প্রতিনিধিদের সঙ্গেও পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
তিস্তা নিয়ে বাড়তি নজর
উত্তরবঙ্গের নদীগুলির মধ্যে তিস্তার পরিস্থিতিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অতীতে পাহাড়ি বিপর্যয় এবং সিকিমের লোনাক হ্রদ বিপর্যয়ের পর তিস্তায় বিপুল পরিমাণ পলি জমার বিষয়টি সামনে এসেছে। নদীর নাব্যতা ও জলপ্রবাহের পরিস্থিতি বিবেচনা করে তিস্তায় খননের কাজ শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছে সেচ দফতর।
রাজ্যের তরফে নদীগুলির কোথায় পলি জমেছে এবং কোথায় খনন জরুরি, তা চিহ্নিত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার উপর জোর দেওয়া হয়েছে। লক্ষ্য, বর্ষার পরবর্তী সময়ে নদীর জলধারণ ক্ষমতা ও প্রবাহের পরিস্থিতি আরও ভালোভাবে সামাল দেওয়া।
অক্টোবরকে সামনে রেখে আগাম প্রস্তুতি
প্রশাসনের নজর শুধু বর্তমান পরিস্থিতিতে নয়। অক্টোবর মাসকে সামনে রেখে আগেভাগেই দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাহাড়ে ভারী বৃষ্টি হলে ধস, নদীর জলস্তর বৃদ্ধি এবং যোগাযোগ ব্যবস্থায় সমস্যা তৈরি হতে পারে। সেই পরিস্থিতিতে যাতে উদ্ধার ও ত্রাণকাজ দ্রুত শুরু করা যায়, তার জন্য বিভিন্ন সংস্থাকে প্রস্তুত রাখার উপর জোর দেওয়া হয়েছে।
পাহাড়ের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী ও রাজ্য বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীকে প্রস্তুত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ কোনও বড় প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঘটার পর ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে আগেই উদ্ধারকারী দল ও প্রশাসনিক পরিকাঠামো প্রস্তুত রাখার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।
শুধু নদী নয়, যোগাযোগ ব্যবস্থাতেও নজর
উত্তরবঙ্গের দুর্যোগ মোকাবিলায় নদী ও পাহাড়ের পাশাপাশি যোগাযোগ ব্যবস্থাকেও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। প্রশাসনিক বৈঠকে রেল ও বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গেও আলোচনা হয়েছে।
রেলের জমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত কয়েকটি বিষয় নিয়েও আলোচনা হয়। অন্যদিকে বাগডোগরা বিমানবন্দরের নতুন রাস্তা তৈরির ক্ষেত্রে জমি সংক্রান্ত সমস্যার কথাও উঠে আসে। বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্য সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ এই প্রস্তুতি?
উত্তরবঙ্গের পাহাড় ও সমতলের নদীগুলি বর্ষায় দ্রুত ফুলে ওঠে। পাহাড়ি এলাকায় অতিবৃষ্টি হলে নদীর জলপ্রবাহের পাশাপাশি ধসের ঝুঁকিও বাড়ে। অতীতে তিস্তা অববাহিকা এবং সিকিম-উত্তরবঙ্গ অঞ্চলে একাধিক বড় প্রাকৃতিক বিপর্যয় প্রশাসনের কাছে সতর্কবার্তা হয়ে রয়েছে।
তাই এবার নদীগুলির বর্তমান অবস্থা, পলি জমার পরিমাণ এবং কোথায় খনন প্রয়োজন—সেই তথ্য আগে থেকেই সংগ্রহ করে ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তবে প্রশাসনের এই প্রস্তুতিকে উত্তরবঙ্গে নতুন করে বড় বন্যা শুরু হয়েছে—এমন কোনও ঘোষণা হিসেবে দেখানো হচ্ছে না। বরং সম্ভাব্য দুর্যোগের আগেই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলি চিহ্নিত করে নদী ও যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রস্তুত রাখাই এখন প্রশাসনের মূল লক্ষ্য।
উত্তরবঙ্গের নদীগুলির বিস্তারিত রিপোর্ট হাতে আসার পর কোন কোন নদীতে কোথায় খনন হবে এবং কী ধরনের অতিরিক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সেদিকেই এখন নজর।
