৭৫ শতাংশ হাজিরা নিয়ে বিক্ষোভ, ২৩ ঘণ্টা ঘেরাওয়ের পর পদত্যাগ উপাধ্যক্ষের; দফতরে ‘শুদ্ধকরণ’ ঘিরে বিতর্ক
কলকাতা: পরীক্ষায় বসার জন্য ন্যূনতম উপস্থিতির হার নিয়ে বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত সুরেন্দ্রনাথ ল কলেজ। পড়ুয়াদের টানা আন্দোলন ও প্রায় ২৩ ঘণ্টা ঘেরাওয়ের পর শুক্রবার পদত্যাগ করেছেন কলেজের উপাধ্যক্ষ তথা ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষা মহম্মাদি তারান্নুম। পদত্যাগের পর তাঁর অভিযোগ, তাঁকে চাপের মুখে ইস্তফা দিতে বাধ্য করা হয়েছে। যদিও তাঁর লিখিত পদত্যাগপত্রে স্বাস্থ্য, পারিবারিক ও ব্যক্তিগত কারণের কথা উল্লেখ রয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত কলেজের সেমেস্টার পরীক্ষায় বসার জন্য উপস্থিতির হার সংক্রান্ত একটি নির্দেশিকাকে ঘিরে। কলেজ কর্তৃপক্ষ জানায়, নিয়ম অনুযায়ী নির্দিষ্ট হারে উপস্থিতি থাকা প্রয়োজন। এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেন একাংশ পড়ুয়া। তাঁদের দাবি, অনেক ছাত্রছাত্রীর উপস্থিতি কম থাকলেও তাঁদের পরীক্ষায় বসার সুযোগ দিতে হবে। বিষয়টি নিয়ে প্রথমে বিক্ষোভ এবং পরে উপাধ্যক্ষকে ঘেরাও করা হয়।
পড়ুয়াদের অভিযোগ, কলেজে নিয়মিত ক্লাস না হওয়া, হঠাৎ ক্লাসের সময় পরিবর্তন এবং উপস্থিতির হিসাব রাখার পদ্ধতিতে স্বচ্ছতার অভাবের কারণে অনেকের উপস্থিতি কমেছে। একাংশ পড়ুয়ার দাবি, আগে সকাল সাড়ে ৮টা থেকে ক্লাস হলেও পরে তা আরও ভোরে শুরু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। উপস্থিতির হিসাব কখনও কাগজের চিরকুট বা বার্তার মাধ্যমে নেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
অন্যদিকে, কলেজ কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, ক্লাসের সময় পরিবর্তনের বিষয়টি আগে থেকেই জানানো হয়েছিল। গভর্নিং বডির চেয়ারম্যান কৌস্তভ বাগচী জানিয়েছেন, উপস্থিতির ক্ষেত্রে কিছু ত্রুটির অভিযোগ সামনে এসেছে এবং আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধানের চেষ্টা চলছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, নির্ধারিত উপস্থিতির নিয়ম থাকলেও সামান্য ঘাটতির ক্ষেত্রে কোনও সমাধানের পথ খোঁজা যায় কি না, তা নিয়েও আলোচনা হয়েছিল।
এর মধ্যেই বৃহস্পতিবার থেকে উপাধ্যক্ষকে ঘেরাও করে বিক্ষোভ শুরু হয়। শুক্রবার তিনি কলেজ থেকে বেরিয়ে দাবি করেন, তাঁকে দীর্ঘ সময় ঘরে আটকে রাখা হয়েছিল এবং খাবার, পানীয় জল ও বিদ্যুৎ থেকেও বঞ্চিত করা হয়েছিল। তাঁর অভিযোগ, নিয়ম মেনে পরীক্ষা নেওয়ার অবস্থান নেওয়ার কারণেই তাঁর উপর চাপ তৈরি করা হয়। তিনি পুরো ঘটনার তদন্তের দাবিও জানিয়েছেন এবং উচ্চশিক্ষা দফতর ও রাজ্য সরকারের হস্তক্ষেপ চেয়েছেন।
তবে বিষয়টির আরেকটি দিকও রয়েছে। উপাধ্যক্ষের লিখিত পদত্যাগপত্রে স্বাস্থ্য, পারিবারিক ও ব্যক্তিগত কারণের উল্লেখ রয়েছে। ফলে তিনি চাপের মুখে পদত্যাগ করেছেন—এটি তাঁর প্রকাশ্য অভিযোগ হলেও, পদত্যাগপত্রে উল্লেখ করা কারণটি আলাদা। এই দুই বক্তব্যকে ঘিরেই ঘটনার প্রকৃত পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
পদত্যাগের পর ‘শুদ্ধকরণ’ ঘিরে নতুন বিতর্ক
উপাধ্যক্ষের পদত্যাগের পর শুক্রবার কলেজে আরও একটি অস্বাভাবিক ঘটনা সামনে আসে। একাংশ পড়ুয়া তাঁর দফতরে ধূপ জ্বালিয়ে এবং গঙ্গাজল ছিটিয়ে প্রতীকী ‘শুদ্ধকরণ’ করেন বলে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। ঘটনাটি নিয়ে ইতিমধ্যেই নানা প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে।
ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে কলেজ চত্বরে উত্তেজনা আরও বেড়েছে। একজন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক আধিকারিকের পদত্যাগের পর তাঁর দফতরকে এভাবে ‘শুদ্ধ’ করার ঘটনা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রতিবাদ ও রাজনৈতিক-সামাজিক প্রতীকের ব্যবহার নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
এদিকে, উপস্থিতির নিয়ম, হাজিরার নথির স্বচ্ছতা এবং পড়ুয়াদের পরীক্ষায় বসার সুযোগ—এই তিনটি বিষয় এখনও মূল বিতর্কের কেন্দ্রে। উপাধ্যক্ষের পদত্যাগের পরও সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়নি। ফলে আসন্ন সেমেস্টার পরীক্ষা এবং কলেজের স্বাভাবিক পঠন-পাঠন কীভাবে চলবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
পুরো ঘটনায় একদিকে রয়েছে নিয়ম মেনে পরীক্ষা নেওয়ার প্রশ্ন, অন্যদিকে পড়ুয়াদের উপস্থিতি ও কলেজ প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে অভিযোগ। তার সঙ্গে উপাধ্যক্ষের পদত্যাগ এবং পরবর্তী ‘শুদ্ধকরণ’ পর্ব যুক্ত হওয়ায় সুরেন্দ্রনাথ ল কলেজের এই ঘটনা এখন কলকাতার শিক্ষা মহলে যথেষ্ট চর্চার বিষয় হয়ে উঠেছে।
