বিতর্কের পর বদলি জলপাইগুড়ি জিলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক ধর্মচাঁদ বাড়ুই
জলপাইগুড়ি: একের পর এক বিতর্ক, স্কুলের ভিতরে নজিরবিহীন অশান্তি এবং প্রশাসনিক গাফিলতি নিয়ে প্রশ্নের মধ্যেই বদলি হলেন জলপাইগুড়ি জিলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক ধর্মচাঁদ বাড়ুই। ২৪ সেপ্টেম্বর স্কুল শিক্ষা দফতরের নির্দেশে তাঁকে জলপাইগুড়ির মেটেলি মডেল স্কুলে বদলি করা হয়েছে। সরকারি নির্দেশে বদলির কারণ হিসেবে ‘জনস্বার্থ’-এর কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এই বদলির পিছনে সবচেয়ে বড় করে সামনে এসেছে ৮ সেপ্টেম্বরের ঘটনা। শিক্ষক দিবস উপলক্ষে স্কুলে বিশেষ খাওয়াদাওয়াকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার নেয়। পড়ুয়াদের অভিযোগ ছিল, মিড-ডে মিলের খাবারের মান ও পরিমাণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই সমস্যা ছিল। সেই বিষয় নিয়ে পড়ুয়াদের সঙ্গে প্রধান শিক্ষকের বচসা হয়। বিভিন্ন প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, প্রধান শিক্ষক পড়ুয়াদের মারধর করেছিলেন। এরপর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং প্রধান শিক্ষকও পড়ুয়াদের হাতে আক্রান্ত হয়ে রক্তাক্ত হন।
ঘটনার গুরুত্ব এতটাই বেড়ে যায় যে শিক্ষা দফতর তদন্ত শুরু করে। শিক্ষামন্ত্রী স্কুলে গিয়ে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখেন। প্রধান শিক্ষককে মারধরের ঘটনায় চার পড়ুয়ার বিরুদ্ধে স্কুল থেকে টিসি দেওয়া হয় এবং আইনি পদক্ষেপও করা হয়।
কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, কীভাবে উত্তরবঙ্গের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিবেশ এমন জায়গায় পৌঁছল? প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা প্রধান শিক্ষকের ভূমিকা নিয়েও তদন্তের পরিসরে প্রশ্ন ওঠে। ১৭ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে শিক্ষা দফতরে জমা পড়া প্রাথমিক রিপোর্টে স্কুল পরিচালনায় গাফিলতি ও দায়িত্ব পালনে শিথিলতার প্রসঙ্গ থাকার কথা জানানো হয়েছিল। যদিও সেই সময় চূড়ান্ত রিপোর্ট বাকি ছিল এবং সংশ্লিষ্ট অভিযোগগুলি প্রমাণিত বলে সরকারি ভাবে ঘোষণা করা হয়নি।
এর আগেও স্কুল পরিচালনা নিয়ে বিতর্কে জড়িয়েছিল প্রধান শিক্ষকের নাম। ২০২৩ সালে স্কুলের ঐতিহ্যবাহী পোশাকের রং পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে পড়ুয়া, অভিভাবক ও প্রাক্তনীদের একাংশের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল। সেই সময়ও সিদ্ধান্তের পক্ষে প্রধান শিক্ষককে প্রকাশ্যে ব্যাখ্যা দিতে হয়েছিল।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন অবশ্য উঠেছে ১৫০ বছরের ঐতিহ্য বহনকারী একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক পরিবেশ নিয়ে। শিক্ষক ও পড়ুয়াদের মধ্যে সম্পর্ক যেখানে শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ তৈরির অন্যতম ভিত্তি, সেখানে প্রধান শিক্ষককে কেন্দ্র করে ছাত্রদের সঙ্গে এমন সংঘাত এবং পরে পুলিশ-প্রশাসনের হস্তক্ষেপ নিঃসন্দেহে গুরুতর পরিস্থিতির ইঙ্গিত দেয়।
শেষ পর্যন্ত শিক্ষা দফতরের বদলির সিদ্ধান্তে ধর্মচাঁদ বাড়ুইকে জিলা স্কুল থেকে সরিয়ে দেওয়া হল। নতুন জায়গায় তাঁর দায়িত্ব কীভাবে পালিত হয়, সেটিও এখন নজরে থাকবে। তবে জলপাইগুড়ি জিলা স্কুলে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ একটি বিষয় স্পষ্ট করে দিয়েছে—প্রশাসনিক পদে থাকা কোনও ব্যক্তিকে ঘিরে বিতর্ক যখন বারবার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক পরিবেশকে প্রশ্নের মুখে ফেলে, তখন সেই দায়িত্বশীল ব্যক্তির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
তবে ধর্মচাঁদ বাড়ুইয়ের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলির ক্ষেত্রে তদন্ত বা সরকারি সিদ্ধান্তে যা প্রমাণিত হয়নি, তাকে সত্য হিসেবে দাবি করা হচ্ছে না।
