৪,১৩৩ স্কুলে নেই একজনও পড়ুয়া, তবুও ১৯,৫০২ শিক্ষক! বাংলার শিক্ষা ব্যবস্থায় বড় প্রশ্ন
নিউজ বাংলা লাইভ ২৪ | কলকাতা
পশ্চিমবঙ্গের স্কুলশিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে কেন্দ্রের প্রকাশিত নতুন পরিসংখ্যানে সামনে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। ৪,১৩৩টি স্কুলে কোনও পড়ুয়া নথিভুক্ত নেই, অথচ সেই স্কুলগুলিতে ১৯,৫০২ জন শিক্ষক কর্মরত রয়েছেন। কেন্দ্রীয় সরকারের UDISE+ 2025-26 রিপোর্টে এই তথ্য উঠে এসেছে।
দেশজুড়ে ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে মোট ৫,৬৬৩টি স্কুলে কোনও পড়ুয়া নেই। তার মধ্যে প্রায় ৭৩ শতাংশই পশ্চিমবঙ্গে। শূন্য-ভর্তির স্কুলের সংখ্যার নিরিখে দেশের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ প্রথম। দ্বিতীয় স্থানে থাকা উত্তরপ্রদেশে এমন স্কুলের সংখ্যা ৩১৩।
একদিকে পড়ুয়াশূন্য স্কুল, অন্যদিকে এক শিক্ষকেই শত শত পড়ুয়া
পরিসংখ্যানের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল—রাজ্যের ৬,৭৬৯টি স্কুলে মাত্র একজন করে শিক্ষক রয়েছেন। অথচ এই স্কুলগুলিতে মোট পড়ুয়ার সংখ্যা প্রায় ২ লক্ষ ২৯ হাজার ৫৬৯। অর্থাৎ, একদিকে এমন স্কুল রয়েছে যেখানে পড়ুয়া নেই অথচ শিক্ষক রয়েছেন, অন্যদিকে বহু স্কুলে বিপুল সংখ্যক পড়ুয়ার দায়িত্ব সামলাচ্ছেন মাত্র একজন শিক্ষক।
এই পরিসংখ্যান শিক্ষক নিয়োগ ও শিক্ষক বণ্টনের পদ্ধতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষজ্ঞ মহলের কাছে বড় প্রশ্ন—রাজ্যের যে স্কুলগুলিতে শিক্ষক প্রয়োজন, সেখানে কীভাবে শিক্ষক পৌঁছবেন এবং পড়ুয়াশূন্য স্কুলগুলিতে থাকা শিক্ষক ও কর্মীদের কীভাবে সঠিক জায়গায় কাজে লাগানো হবে?
তথ্যের ভুলের দাবিও রাজ্য সরকারের
তবে কেন্দ্রীয় রিপোর্টের এই পরিসংখ্যান নিয়ে রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যাও দেওয়া হয়েছে।
স্কুলশিক্ষামন্ত্রী দীপক বর্মনের বক্তব্য, কিছু বেসরকারি স্কুল UDISE+ পোর্টালে শিক্ষক সংক্রান্ত তথ্য আপলোড করলেও পড়ুয়াদের তথ্য সঠিকভাবে আপলোড করেনি। ফলে কিছু স্কুলের ক্ষেত্রে পড়ুয়ার সংখ্যা শূন্য দেখালেও শিক্ষক রয়েছেন—এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়ে থাকতে পারে। এই ধরনের তথ্যগত অসঙ্গতি সংশোধনের জন্য ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে তিনি জানিয়েছেন।
অর্থাৎ, রিপোর্টে থাকা ৪,১৩৩টি স্কুলের প্রতিটিতেই বাস্তবে কোনও পড়ুয়া নেই—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর আগে সংশ্লিষ্ট তথ্য যাচাই করাও গুরুত্বপূর্ণ।
শিক্ষক বণ্টনে ‘র্যাশনালাইজেশন’-এর উদ্যোগ
রাজ্য সরকার জানিয়েছে, শিক্ষক বণ্টনের ক্ষেত্রে র্যাশনালাইজেশন বা যুক্তিসঙ্গত পুনর্বণ্টন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। যেসব স্কুলে শিক্ষক প্রয়োজনের তুলনায় বেশি, সেখান থেকে শিক্ষককে এমন স্কুলে পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে যেখানে শিক্ষক-সংকট রয়েছে।
এর ফলে একদিকে পড়ুয়াশূন্য বা অতিরিক্ত শিক্ষক থাকা স্কুলের সমস্যা কমানো এবং অন্যদিকে শিক্ষক-সংকটে থাকা স্কুলগুলিতে প্রয়োজনীয় শিক্ষক পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
CAG রিপোর্টেও উঠে এসেছে শিক্ষক-সংকট
শুধু UDISE+ রিপোর্ট নয়, সম্প্রতি প্রকাশিত CAG-এর অডিট রিপোর্টেও পশ্চিমবঙ্গের স্কুলশিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষক বণ্টনের অসামঞ্জস্যের ছবি উঠে এসেছে।
CAG-এর তথ্য অনুযায়ী, রাজ্যের ৫২০টি স্কুলে মোট ৮,৫৯৬ জন পড়ুয়া থাকলেও কোনও শিক্ষক ছিলেন না। আরও ৫,১৫২টি স্কুলে মাত্র একজন করে শিক্ষক ছিলেন, যেখানে মোট পড়ুয়ার সংখ্যা ১.৭৬ লক্ষেরও বেশি। প্রাথমিক ও উচ্চপ্রাথমিক স্তরেও নির্ধারিত ছাত্র-শিক্ষক অনুপাত পূরণ করতে শিক্ষক ঘাটতির কথা রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।
শুধু শিক্ষক নয়, পড়ুয়া কমার ছবিও উদ্বেগের
UDISE+ তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে মোট ৯৩,১৪৭টি স্কুল রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৮ শতাংশ স্কুলে পড়ুয়ার সংখ্যা ১০ বা তার কম। অন্যদিকে প্রায় ৮.৫ শতাংশ স্কুলে পড়ুয়ার সংখ্যা ৫০০-র বেশি। অর্থাৎ, রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে স্কুলগুলির ছাত্রসংখ্যা এবং শিক্ষক বণ্টনের মধ্যে উল্লেখযোগ্য বৈষম্য রয়েছে।
এখন বড় প্রশ্ন—তথ্য সংশোধন ও শিক্ষক বণ্টন কত দ্রুত?
৪,১৩৩টি পড়ুয়াশূন্য স্কুল এবং সেখানে ১৯,৫০২ শিক্ষক থাকার পরিসংখ্যান সামনে আসার পর রাজ্যের স্কুলশিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
তবে বিষয়টির দুটি দিক রয়েছে—একদিকে UDISE+ তথ্যের সত্যতা ও তথ্য আপলোডের ভুল সংশোধন, অন্যদিকে বাস্তবে শিক্ষক যেখানে প্রয়োজন সেখানে তাঁদের দ্রুত পৌঁছে দেওয়া।
রাজ্য সরকারের র্যাশনালাইজেশন প্রক্রিয়া এবং তথ্য সংশোধনের উদ্যোগ কতটা কার্যকর হয়, এখন সেদিকেই নজর। একই সঙ্গে CAG-এর রিপোর্টে উঠে আসা শিক্ষক-সংকটও দ্রুত সমাধান করা সম্ভব হয় কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
নিউজ বাংলা লাইভ ২৪
