হরমুজ প্রণালীতে আমেরিকা–ইরান সংঘাত, চরম উদ্বেগে বিশ্ববাজার
নিজস্ব সংবাদদাতা: মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকা ও ইরানের সংঘাত নতুন করে আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। এবার সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী। এই জলপথে তেলবাহী জাহাজে হামলা এবং পাল্টা হামলার জেরে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গিয়েছে। ফলে বিশ্বজুড়ে তেল সরবরাহ নিয়ে নতুন করে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
গত শনিবার আমেরিকান বাহিনী তিনটি ইরানি তেলবাহী জাহাজে হামলা চালানোর কথা জানায়। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের দাবি, এর আগে ইরানের ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কর্পস দুটি মার্কিন নৌযানকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে লক্ষ্য করেছিল। তারই জবাবে তিনটি ইরানি তেলবাহী জাহাজে হামলা চালানো হয়।
এরপর ইরানও পাল্টা পদক্ষেপের কথা জানায়। ইরানের রেভলিউশনারি গার্ডের দাবি, তারা হরমুজ প্রণালীর নির্দিষ্ট অনুমোদনহীন পথে চলা কয়েকটি ট্যাঙ্কার এবং মার্কিন-ঘনিষ্ঠ কয়েকটি জাহাজকে লক্ষ্য করেছে। তবে এসব দাবির সবকটির স্বাধীনভাবে যাচাই সম্ভব হয়নি।
রবিবার ইরান আরও দাবি করে, হরমুজ প্রণালীতে প্রবেশের চেষ্টা করা একটি মার্কিন চালকবিহীন সামরিক নৌযানকে তারা আঘাত করেছে। তবে মার্কিন সামরিক বাহিনী এই দাবি সরাসরি অস্বীকার করে একে সম্পূর্ণ মিথ্যা বলে অভিহিত করেছে। ফলে এই হামলার দাবি এখনও বিতর্কিত।
কমছে জাহাজ চলাচল
সংঘাতের সরাসরি প্রভাব পড়েছে হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে। জাহাজ চলাচলের তথ্য বিশ্লেষণকারী সংস্থা কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ দিনে এই জলপথ দিয়ে প্রতিদিন গড়ে মাত্র ১০টি পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল করেছে। মে মাসের পর এটি সর্বনিম্ন। রবিবার মাত্র ছয়টি জাহাজ প্রণালী অতিক্রম করেছে। এমনকি একটি সৌদি বন্দর থেকে আসা পরিশোধিত জ্বালানি বহনকারী একটি ট্যাঙ্কার হরমুজ দিয়ে বের হওয়ার চেষ্টা করেও ফিরে যায়।
হরমুজ প্রণালী দিয়ে স্বাভাবিক সময়ে বিপুল পরিমাণ তেল পরিবহণ হয়। ফলে এই জলপথে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা তৈরি হলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
নতুন ‘নিয়ন্ত্রিত এলাকা’ তৈরির হুমকি ইরানের
পরিস্থিতি আরও জটিল করে ইরান জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালীর কাছে একটি নতুন নিয়ন্ত্রিত সামুদ্রিক এলাকা তৈরি করা হবে। ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা মোহসেন রেজায়ির বক্তব্য অনুযায়ী, এই এলাকার সঙ্গে সমন্বয় রেখে ওমানের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে নতুন জাহাজ চলাচলের পথও ঘোষণা করা হতে পারে।
একই সঙ্গে ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, আমেরিকা আরও হামলা চালালে ইরানের পাল্টা জবাব আরও কঠোর হবে। ফলে আগামী দিনে হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে সামরিক উত্তেজনা আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বাড়ছে অপরিশোধিত তেলের দাম
হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল কমে যাওয়ার সরাসরি প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে। সোমবার ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়ে প্রায় ৯৭ ডলার প্রতি ব্যারেল হয়েছে। মার্কিন ডব্লিউটিআই অপরিশোধিত তেলের দামও ৯২ ডলারের ওপরে উঠেছে। গত সপ্তাহে ব্রেন্টের দাম প্রায় ৭.৮ শতাংশ এবং ডব্লিউটিআই-এর দাম প্রায় ১০ শতাংশ বেড়েছিল।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল আরও কমে গেলে শুধু তেলের দাম নয়, পরিবহণ খরচ, জ্বালানি সরবরাহ এবং বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতির ওপরও চাপ বাড়তে পারে। এশিয়ার দেশগুলির জন্য ঝুঁকি আরও বেশি, কারণ উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে আসা জ্বালানি সরবরাহের ওপর এই অঞ্চলের অর্থনীতিগুলির বড় নির্ভরতা রয়েছে।
সামনে কী?
এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, আমেরিকা ও ইরানের সংঘাত কতটা ছড়িয়ে পড়বে এবং হরমুজ প্রণালী দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কতদিন ব্যাহত থাকবে। সামরিক সংঘাত যদি আরও বাড়ে এবং তেল পরিবহণ দীর্ঘ সময়ের জন্য বাধাগ্রস্ত হয়, তাহলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম আরও বাড়তে পারে।
ফলে হরমুজ প্রণালী এখন শুধু আমেরিকা ও ইরানের সংঘাতের ক্ষেত্র নয়—বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং অর্থনীতির জন্যও বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।
