তাসিংয়ে ভারত-চিন সীমান্তে উত্তেজনা, মুখোমুখি অবস্থানের পর কোর কমান্ডার বৈঠকে বসছে দুই দেশ
নয়াদিল্লি: অরুণাচল প্রদেশের আপার সুবানসিরি জেলার তাসিং এলাকায় ভারত ও চিনের সেনাদের মধ্যে সাম্প্রতিক মুখোমুখি অবস্থানকে ঘিরে নতুন করে সীমান্ত উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতির মধ্যেই উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণ এবং সীমান্তে কোনও ভুল বোঝাবুঝি যাতে বড় আকার না নেয়, তা নিশ্চিত করতে ভারত ও চিনের মধ্যে কোর কমান্ডার পর্যায়ের বৈঠক হতে চলেছে।
সর্বশেষ খবর অনুযায়ী, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে ভারতীয় সেনার তৃতীয় কোরের কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল গিরিশ কালিয়া চিনা প্রতিপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের সঙ্গে আলোচনায় বসতে পারেন। তাসিং এলাকায় সাম্প্রতিক পরিস্থিতি এই বৈঠকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে।
তাসিংয়ে ভারত-চিনের মধ্যে কী হয়েছিল?
অরুণাচল প্রদেশের অত্যন্ত দুর্গম তাসিং এলাকায় গত জুলাইয়ের শেষ দিকে ভারতীয় ও চিনা টহলদল মুখোমুখি অবস্থানে এসেছিল বলে একাধিক প্রতিবেদনে উঠে আসে। এরপর আগস্ট মাসে ওই এলাকায় চিনা বাহিনীর গতিবিধি এবং সীমান্তে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হওয়ার খবর সামনে আসে।
ঘটনাকে ঘিরে চিনা বাহিনীর ভারতীয় ভূখণ্ডে প্রবেশ বা সীমান্তের অবস্থান পরিবর্তনের অভিযোগও ওঠে। স্থানীয় রাজনৈতিক মহলের একটি তথ্য-অনুসন্ধান কমিটি তাসিং এলাকায় চিনা পিপলস লিবারেশন আর্মির গতিবিধি এবং ভারতীয় সেনার টহল সংক্রান্ত সমস্যার অভিযোগ তুলেছিল।
তবে এই অভিযোগগুলির সবকটিই সরকারি ভাবে নিশ্চিত হয়েছে, এমন নয়। বরং ওই সময় ভারতীয় প্রতিরক্ষা সূত্র এবং অরুণাচল প্রদেশের প্রশাসনের তরফে চিনা অনুপ্রবেশ নিয়ে প্রকাশিত কিছু দাবিকে অস্বীকার করা হয়েছিল। ফলে তাসিংয়ের ঘটনায় নিশ্চিত তথ্য, স্থানীয় অভিযোগ এবং সরকারি বক্তব্য—তিনটিকে আলাদা করে দেখা জরুরি।
উত্তেজনার মধ্যেই সেনা পর্যায়ে একাধিক আলোচনা
তাসিংয়ের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হলেও ভারত ও চিনের মধ্যে সামরিক যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলিতে স্থানীয় কমান্ডার পর্যায়ে দুই দেশের মধ্যে একাধিক দফা আলোচনা হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে।
এবার সেই যোগাযোগ আরও উচ্চতর সামরিক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ভারতীয় সেনার তৃতীয় কোর, অর্থাৎ ‘স্পিয়ার কোর’, নাগাল্যান্ড, মণিপুর এবং অরুণাচল প্রদেশের মধ্য ও পূর্বাঞ্চলের প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা সংলগ্ন এলাকার সামরিক দায়িত্বে রয়েছে। এই কোরের কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল গিরিশ কালিয়ার চিনা প্রতিপক্ষের সঙ্গে বৈঠকের কথা রয়েছে।
ডোভাল–ওয়াং বৈঠকের পরেই নতুন পদক্ষেপ
তাসিংয়ে সীমান্ত উত্তেজনার মধ্যেই কয়েক দিন আগে বেজিংয়ে ভারত ও চিনের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক আলোচনা হয়েছে। ২৫ আগস্ট ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল এবং চিনের বিদেশমন্ত্রী ও বিশেষ প্রতিনিধি ওয়াং ই ২৫তম দফার বিশেষ প্রতিনিধি পর্যায়ের বৈঠকে অংশ নেন।
সীমান্তে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, সীমান্ত সমস্যা নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নিয়ে যাওয়া এবং মাটিতে তৈরি হওয়া পরিস্থিতি দ্রুত সামাল দেওয়ার জন্য কূটনৈতিক ও সামরিক যোগাযোগ আরও কার্যকর করার বিষয়ে দুই দেশ একাধিক সিদ্ধান্তে পৌঁছয়।
দুই দেশ সামরিক কমান্ডার পর্যায়ে যোগাযোগের জন্য অতিরিক্ত বৈঠকস্থল এবং পূর্ব ও মধ্যাঞ্চলে নতুন সামরিক হটলাইন তৈরির বিষয়েও এগোনোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ এই বৈঠক?
ভারত-চিন সীমান্তে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিরোধ রয়েছে। তাই সীমান্তে কোনও স্থানীয় ঘটনা বা টহলদলের মুখোমুখি অবস্থান যাতে বড় ধরনের সামরিক সংঘাতে পরিণত না হয়, সে জন্য দুই দেশের সেনাবাহিনীর মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ।
তাসিংয়ের সাম্প্রতিক পরিস্থিতির পর কোর কমান্ডার পর্যায়ের বৈঠক সেই কারণেই তাৎপর্যপূর্ণ। বৈঠকে সীমান্তের মাটির পরিস্থিতি, টহল নিয়ে তৈরি হওয়া সমস্যা, স্থানীয় পর্যায়ে যোগাযোগ এবং ভবিষ্যতে এই ধরনের ঘটনা এড়ানোর উপায় নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
আপাতত লক্ষ্য উত্তেজনা কমানো
তাসিংয়ের ঘটনা ভারত-চিন সীমান্তে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করলেও, একই সময়ে দুই দেশ কূটনৈতিক ও সামরিক স্তরে যোগাযোগ বাড়ানোর চেষ্টা করছে। ডোভাল–ওয়াং বৈঠকের পর কোর কমান্ডার পর্যায়ের আলোচনার উদ্যোগ সেই ধারারই অংশ বলে মনে করা হচ্ছে।
তবে তাসিংয়ে চিনা অনুপ্রবেশের বিভিন্ন অভিযোগকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বিশেষ করে চিনা বাহিনী ভারতের ৬০ কিলোমিটার ভিতরে ঢুকে পড়েছে—এমন দাবিরও সরকারি নিশ্চিতকরণ নেই। তাই বর্তমানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, তাসিংয়ে তৈরি হওয়া উত্তেজনা নিয়ে ভারত ও চিনের সেনা সরাসরি আলোচনায় বসছে এবং পরিস্থিতি যাতে আরও না বাড়ে, সেই পথেই এগোচ্ছে দুই দেশ।
